Posted in

অগস্টে অভিষেক, অগস্টেই বিদায়! লাল কার্ড, ভগ্ন হৃদয়, অবসর ভেঙে ফিরে বিশ্বকাপ জয়, আর্জেন্টিনার সঙ্গে ২১ বছরের সম্পর্ক শেষ মেসির

আর্জেন্টিনাকে তিনি সব কিছু দিয়েছেন। অনবরত সমালোচনা, তুলনা, দিয়েগো মারাদোনায় ছায়ায় কাটাতে হয়েছে। বিদায়বেলায় হাতে বিশ্বকাপ না থাকলেও, লিয়োনেল মেসি অবসর নিলেন মাথা উঁচু করেই।

কোনও ডিফেন্ডারকে কাটাতে হয়নি। কোনও গোলকিপারকে ধোঁকা দিতে হয়নি। কোনও বাঁপায়ের জাদু দেখাতে হয়নি। স্রেফ ডায়েরি থেকে ছেঁড়া তিনটি পাতায় কয়েকশো শব্দ। তাতেই শেষ হয়ে গেল ২১ বছরের একটি সম্পর্ক। এই ২১ বছরে তিনি যে অবিস্মরণীয় সব স্মৃতি, হাসি, কান্না, আনন্দ, উৎসবের মুহূর্ত উপহার দিয়েছেন, সোমবার রাতের পর থেকে সব অতীত হয়ে গেল। লিয়োনেল মেসি রবিবার পর্যন্ত আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ছিলেন। সোমবার থেকে ‘প্রাক্তন’ হয়ে গেলেন। থেকে গেল অভিষেকেই লাল কার্ড, প্রথম অবসর ভেঙে ফিরে বিশ্বকাপ, দু’বার ফাইনালে স্বপ্নভঙ্গের স্মৃতি।

২১ বছর ধরে তিনি বিপক্ষ ডিফেন্ডারদের অগণিত কড়া ট্যাকল সামলেছেন। কোটি কোটি ভক্তের প্রত্যাশার মূল্য দিতে চেয়েছেন। অনবরত তুলনায় বিদ্ধ হয়েছেন। আর্জেন্টিনার জার্সিতে দিয়েগো মারাদোনার ছায়ায় জীবনের অধিকাংশ সময়টা কাটিয়েছেন। সোমবার, ৩১ অগস্ট, ৩৯ বছরের ফুটবলার জীবনের শেষ ড্রিবলটা আর করতে পারলেন না। বয়স, আবেগ, প্রত্যাশার কাছে হার মেনে জানিয়ে দিলেন, এই শেষ। আর নয়। আর তাঁকে নীল-সাদা জার্সিতে দেখা যাবে না।

সত্যিই কি সোমবার মেসি অবসর নিলেন? তা তো নয়। তিনি নিজেই লম্বা বার্তায় জানিয়েছেন, অবসরের সিদ্ধান্ত লেখা হয়ে গিয়েছিল স্পেনের কাছে বিশ্বকাপ ফাইনালে হারের দু’দিন পরেই। বাবার মৃত্যু, মানসিক ক্লান্তি এবং বিবিধ সমস্যা কাটিয়ে উঠে অবশেষে সোমবার সেই ঘোষণাটি করতে পেরেছেন। মাঝের এই সময়ে ক্লাবের জার্সিতে দেখে এক বারও মনে হয়নি তাঁর অবসর আসন্ন। দিন দুয়েক আগেই একটি ম্যাচে চার গোল করলেন। সমর্থকেরা বলাবলি শুরু করলেন, মেসির কাছে বয়স নেহাতই সংখ্যা। মেসি সোমবারের বার্তায় বুঝিয়ে দিলেন, বয়স সংখ্যা নয়। বয়সের কাছে হার মানতে হয় সকলকেই।

“আমার হৃদয় ভারাক্রান্ত। কিন্তু আমি জানি সেই সময়টা এসে গিয়েছে। আন্তর্জাতিক ফুটবলকে বিদায় জানানোর সেরা সময় এটাই।” মেসির লম্বা বার্তার আসল নির্যাস এই কয়েকটি বাক্যেই। এমন নয় যে তিনি এই ঘোষণা করে সকলকে চমকে দিয়েছেন। বরং বিশ্বকাপের আগে, মাঝে এবং পরেও জল্পনা চলছিলই। কবে বিদায় জানাবেন তিনি? অপেক্ষা ক্রমশই বেড়ে যাচ্ছিল। সোমবার মেসি সব অপেক্ষার অবসান ঘটালেন। জানিয়ে দিলেন, আর তাঁকে নিয়ে বেশি ভাবার প্রয়োজন নেই।

আর্জেন্টিনার হয়ে ২০৭টি ম্যাচে ১২৫টি গোল করেছেন মেসি। আন্তর্জাতিক ফুটবলে গোলের নিরিখে ক্রিশ্চিয়ানো রোনাল্ডোর পরেই। বিশ্বকাপে গোলের নিরিখে কিলিয়ান এমবাপের পিছনে। দেশের হয়ে ২০২১, ২০২৪-এর কোপা আমেরিকা, ২০২২-এর ফাইনালিসিমা এবং সর্বোপরি, ২০২২-এর বিশ্বকাপ রয়েছে। এ ছাড়াও দু’টি বিশ্বকাপ ফাইনালে পরাজিতের পদকও রয়েছে।

৪৭ সেকেন্ডে লাল কার্ড

এক অগস্টেই নীল-সাদা জার্সি গায়ে অভিযান শুরু হয়েছিল মেসির। বুদাপেস্টে হাঙ্গেরির বিরুদ্ধে খেলতে নেমেছিলেন ১৮ বছরের মেসি। পরনে ছিল ১৮ নম্বর জার্সি। ম্যাচের ৪৭ সেকেন্ডের মাথায় ভিলমোস ভানচাক তাঁর জার্সি টেনে ধরেছিলেন। ঝাঁকড়া সোনালি চুলের বিরক্ত মেসি সপাটে চালিয়েছিলেন হাত। রেফারির নজর এড়ায়নি। অভিষেক ম্যাচে ৪৭ সেকেন্ডেই লাল কার্ড! যে কোনও ফুটবলারের কাছেই এমন ঘটনা কেরিয়ার শেষ করে দেওয়ার জন্য যথেষ্ট।

মেসির ক্ষেত্রে তা হয়নি। ভাগ্যিস হয়নি! আর্জেন্টিনার হয়ে খেলা এমনিতেই সহজ নয়। প্রতিটি স্পর্শ পরীক্ষা করা হয়। প্রতিটি ব্যর্থতাকে জোরালো ভাবে তুলে ধরা হয়। বার্সেলোনার হয়ে প্রতিটি সাফল্যের সঙ্গে তুলনা করে বলা হয়েছে, কী দিয়েছেন তিনি আর্জেন্টিনাকে? কেন ক্লাবের ফর্ম দেশের হয়ে দেখাতে পারেন না?

আসলে বার্সেলোনা কোনও শর্ত ছাড়াই তাঁকে খেলতে দিয়েছিল। আর্জেন্টিনায় সেই উপায় ছিল না। অদৃশ্য এক বেড়ি মেসিকে বেঁধে রেখেছিল। তা ছিল মারাদোনার সঙ্গে প্রতিনিয়ত তাঁর তুলনা। স্বভাবগত ভাবেই আর্জেন্টিনীয়েরা আবেগপ্রবণ। কীর্তি সোল্লাসে চিৎকার করে বলতে ভালবাসেন। মেসি সেখানে নরম ভাবে কথা বলেন। দেশপ্রেম দেখান না। ক্যামেরা দেখলেই লুকিয়ে যান। তিনি আর্জেন্টিনীয়দের পছন্দের মানুষ হবেন কী করে? ফলে দেশের প্রতি দায়বদ্ধতা বোঝাতেই অনেক সময় লেগেছে মেসির।

ব্যর্থতার হ্যাটট্রিক এবং অবসর

২০০৬ এবং ২০১০ বিশ্বকাপে লজ্জাজনক দুই বিদায় মেসির মনে গভীর ভাবে প্রভাব ফেলেছিল। কিন্তু আর্জেন্টিনার হয়ে ভাল কিছু করার ইচ্ছা তাঁকে দমিয়ে রাখতে পারেনি। প্রতিবেশী দেশ ব্রাজ়িলে হওয়া বিশ্বকাপে কার্যত একার হাতে দলকে ফাইনালে তুলেছিলেন মেসি। সতীর্থদের ব্যর্থতার কারণে হারতে হয়েছিল। পরের দু’বছর কোপা আমেরিকার ফাইনালে তুলেছিলেন। দু’বারই হারতে হয়েছিল। কত আর সতীর্থদের দোষ দেবেন? মেসি বুঝতে পারছিলেন কোথায় ফারাক হয়ে যাচ্ছে। বার্সেলোনায় তাঁর ভাল খেলার আসল কারণ পাশে থাকা জ়াভি, আন্দ্রে ইনিয়েস্তার মতো ফুটবলারেরা। আর্জেন্টিনায় সে সব কোথায়। সে কারণেই ২০১৬-য় কোপা আমেরিকা ফাইনাল হারের পর বুক ফাটা কান্না বেরিয়ে এসেছিল। নিজেকে সামলে রাখতে পারেননি। টাইব্রেকাকে শট উড়িয়ে দেওয়ার পর ডাগআউটে দাঁড়িয়ে অঝোরে কেঁদেছিলেন।

বোমা ফাটিয়েছিলেন মাঠ থেকে বেরোনোর সময়। সাংবাদিকদের বলেছিলেন, “জাতীয় দলের হয়ে আমার সময় শেষ। যতটা পেরেছি নিজেকে নিংড়ে দেওয়ার চেষ্টা করেছি। চ্যাম্পিয়ন না হওয়ার ব্যথা সারাজীবন থাকবে।” তাঁর মতো ফুটবলার ২৯ বছরে দেশের জার্সিকে বিদায় জানাবেন! এমনটা হতে পারে? গোটা বিশ্ব থেকে তাঁর প্রতি সমবেদনা ভেসে এল। অনেকেই অবসর ফেরানোর অনুরোধ করলেন। বুয়েনোস আইরেসে মিছিল বেরোলো মেসির সমর্থনে। তৎকালীন প্রেসিডেন্ট মৌরিসিয়ো মাক্রি নিজে ফোন করে মেসিকে অবসরের সিদ্ধান্ত ফেরানোর অনুরোধ করলেন। বাচ্চারা রাস্তায় নেমে ব্যানারে লিখল, ‘অভিমানে চলে যেয়ো না’।

এই আবেগ মেসি ফেলতে পারেননি। তিনি ফিরলেন। আবার সেই চাপ, সমালোচনার বিরুদ্ধে খেলার সিদ্ধান্ত নিলেন। সেই সিদ্ধান্ত হিতে বিপরীত হল। ২০১৮ বিশ্বকাপে সঙ্গী হল সেই লজ্জার বিদায়। পরের বছর কোপা আমেরিকা ফাইনালে হারতে হল। আরও বদ্ধমূল হল সেই ধারণা, মেসি ক্লাবের হয়ে সব ট্রফি জিততে পারেন। শুধু আর্জেন্টিনার জার্সিতে ট্রফি জিততে পারেন না। তত দিনে পর্তুগালের জার্সিতে রোনাল্ডোর আন্তর্জাতিক ট্রফি (২০১৬ ইউরো কাপ) জেতা হয়ে গিয়েছে।

মারাকানায় কান্না

বহু প্রতীক্ষিত সেই দিনটি এল ২০২১-এর ১০ জুলাই। আঙ্খেল দি মারিয়ার গোলে কোপা আমেরিকার ফাইনালে ব্রাজ়িলকে হারিয়ে প্রথম বার আন্তর্জাতিক ট্রফি জিতলেন মেসি। শেষ বাঁশি বাজার পরেই মাটিতে শুয়ে পড়েছিলেন। ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদছিলেন শিশুর মতো। বিশ্বাসই করতে পারছিলেন না আর্জেন্টিনার হয়ে ট্রফি জিতেছেন।

দৌড়ে এসে মেসিকে জড়িয়ে ধরেছিলেন সতীর্থেরা। মনে মনে শপথও নিয়েছিলেন, এত দিন মেসি আর্জেন্টিনাকে একার হাতে টেনেছেন। এ বার তাঁরা মেসির জন্য আর্জেন্টিনাকে টানবেন। ওই এক শপথ বদলে দিল সব কিছু।

মেসি ১৬ বছর নীল-সাদা জার্সিতে যা পাননি, ওই রাতের পর সবই পেয়ে গেলেন।

কাতারে স্বপ্নপূরণ

প্রথম ম্যাচেই সৌদি আরবের কাছে হার। বিশ্বকাপের শুরুতেই অঘটন। ভাইরাল হল সৌদি সমর্থকের ‘হোয়্যার ইজ মেসি’ সংলাপ। মুখ নামিয়ে, তীব্র হতাশায় মেসি মাঠ ছেড়েছিলেন। তবে পণও করেছিলেন, এক ভুল বার বার করা যাবে না। অনেক হয়েছে ব্যর্থতা। এ বার জবাব দিতে হবে। তার পর থেকে বাকি প্রতিযোগিতায় ধ্বংসলীলা চালিয়েছিল আর্জেন্টিনা। সামনে যে-ই এসেছিল, উড়ে গিয়েছিল। ফ্রান্সের বিরুদ্ধে ফাইনালে জোড়া গোল। অতিরিক্ত সময়ের শেষ মুহূর্তে এমিলিয়ানো মার্তিনেসের ওই সেভ বুঝিয়ে দিয়েছিল, এই বিশ্বকাপ মেসির জন্যই রাখা আছে। সতীর্থদের কাঁধে চেপে একগাল হাসি নিয়ে, এক হাতে বিশ্বকাপ নাচাতে নাচাতে মেসি কি ভাবছিলেন, এ বার অবসর নিয়ে ফেলা যাক?

জাত ফুটবলারের খিদে সহজে কমে না। বরং সাফল্যের সঙ্গে তা আরও বাড়ে। মেসির সঙ্গেও তাই হয়েছে। বিশ্বকাপের পরেও অবসর নেওয়ার দিকে গেলেনই না। উল্টে দু’বছর পর আর একটা কোপা আমেরিকা জিতে নিলেন।

আমেরিকায় শেষ দৌড়

২০২৬ বিশ্বকাপ খেলবেন কি না, তা নিয়ে জল্পনা জিইয়ে রেখেছিলেন শেষ পর্যন্ত। কেউ কোনও চাপ দেননি মেসিকে। আর্জেন্টিনার অধিনায়ক ঠিক করেই নেমেছিলেন, আর একটা স্মরণীয় দৌড় তাঁর প্রাপ্য। শুরুটা হল আলজেরিয়ার বিরুদ্ধে হ্যাটট্রিক দিয়ে। পর পর ম্যাচে গোল করে গেলেন। দলও অনায়াসে গ্রুপ পর্ব অতিক্রম করে ফেলল।

তবে চার বছর আগের সেই দলের সঙ্গে এই দলের যে অনেক তফাত, সেটা বুঝতে পারছিলেন সমর্থকেরা। হয়তো বুঝেছিলেন মেসি নিজেও। কাবো ভার্দে, মিশর ম্যাচে কান ঘেঁষে জয়। সুইৎজ়ারল্যান্ড, ইংল্যান্ড কঠিন পরীক্ষায় ফেলল আর্জেন্টিনাকে। তবু শেষমেশ ফাইনালেয়। মেসি সমর্থকেরা জয়ের স্বপ্নে বিভোর।

কিন্তু সব বিদায় রূপকথার মতো হয় না। মেসিরও হল না। ফাইনালে আর্জেন্টিনার হতাশাজনক, নেতিবাচক ফুটবল নিন্দা কুড়োল বিশ্বের। মেসি সমালোচনার হাত থেকে রেহাই পেলেন না। পাপড়ি ফেলা পথের শেষ বাঁকে অপেক্ষা করে ছিল কাঁটা।

তবু কোনও ভাবেই তাঁর কৃতিত্বকে অস্বীকার করার জায়গা নেই। আর্জেন্টিনার ফুটবল ততটাই মনে রাখবে মেসিকে, যতটা মনে রেখেছে মারাদোনাকে।

আর সমর্থকদের কাছে? একটাই শব্দ। ঈশ্বর।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *